২৪ শে আগস্ট হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে ২৫ শে আগস্ট বিকেলে হরিদ্বার।। হরিদ্বারে কালিকমলী তে রাতের থাকায় ব্যবস্থা।। তার ফাঁকে হরিদ্বারে হর কি পৌরি ঘাটে একটু ঢুঁ মেরে আসা।। আগামী কাল আমরা রওনা দেব বদ্রীনাথের উদ্দেশ্যে।
কালিকমলী তে রাত কাটিয়েছি বেশ ভালোই। অবশ্য আমরা তিন চার জন একটু শুয়েছি বাকিরা সারারাত আড্ডা মেরে কাটিয়েছে। ভোর 5 টায় গাড়ি আসার কথা। তাই ভোর ৪ টে তে উঠে পড়লাম। ফোনের ঘন্টা টা বেজে উঠল। হেমন্ত ফোন করেছে, ওরা তিনজন আসছে দিল্লি থেকে। ওরা সময় মত চলে এসেছে হরিদ্বার কিন্তু পবন এখনও আসেনি, ফোনে ও পাওয়া যাচ্ছেনা। ওদিকে গাড়ি এসে হাজির। ওর জন্যে আমরা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। বাইরের চায়ের দোকান থেকে চা খেলাম সবাই। ঘড়ির কাঁটা তখন ৫ টা পেরিয়ে ৬ টার ঘরে। ওদিকে যেতে হবে সেই বদ্রীনাথ। শেষে ফোনে পাওয়া গেল। ও দিল্লি থেকে বাসে আসছে। হরিদ্বার থেকে এখনও ১ কিমি দুরে আছে। শেষ মেষ ৭ টার সময় পবন এসে হাজির। আমাদের লাগেজ সব গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে। পবন আসার সাথে সাথে গাড়ি ছেড়ে দিল বদ্রীনাথের উদ্দেশ্যে । প্রাতরাশ আমরা পথেই সারব। আমাদের আরেক সদস্য জিবিন, সে আবার বাইক রাইডে গেছিল লাদাখ। সেখান থেকে বাইক নিয়ে চলে এসেছে। সে ঋষিকেশে গেছে তার বন্ধুর বাড়িতে বাইক রাখতে। সাথে গেছে দেবাশিস। ওরা ঋষিকেশে থেকে গাড়িতে উঠবে। ঋষিকেশ আসতেই ওরা উঠে পড়ল। এবার গাড়ি পাহাড়ী রাস্তা ধরল। আকা বাঁকা পথে গাড়ি চলেছে। মনে খুবই উৎসাহ সবার। একেক টা পাহাড়ী বাঁক ঘুরছি আর দৃশ্যপট ও বদলে যাচ্ছে। প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘন্টা গাড়িতে যেতে হবে। দুপুর 2 টো নাগাদ গাড়ি থামল দুপুরের আহারের জন্য। দুপুরের খাওয়া সেরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। এবার গাড়ি থামবে সেই বদ্রীনাথ।। বিকাল ৪ টে নাগাদ পৌঁছলাম যোশীমঠ। এখানে আমাদের সাথে দেখা হল রাওয়াত জির। ওনার সাথেই যাব আমরা। দেখা হল আযমাদের গাইড প্রেম জি আর গুমান জির সঙ্গে। কিন্তু একটা খারাপ খবর কানে এসে পৌছাল। গাড়ি আর আগে যাবেনা, আগে ল্যান্ড স্লাইড হয়েছে। রাস্তা পুরো ধসে গেছে। তাই আমাদের
থামতে হল গোবিন্দ ঘাটে। আকাশের মুখ ও ভার। শুরু হল বৃষ্টি। বৃষ্টির মধ্যেই লাগেজ নামানো হল গাড়ি থেকে। রাওয়াত জি একটা ঘর ঠিক করেছে এখানে। এখানেই আমাদের রাতে থাকতে হবে। ওদিকে শুভজিৎ দা রাওয়াত এর সাথে গেছে রাস্তার হাল দেখতে। ওরা ফেরার পর সন্ধ্যা বেলায় চা খেয়ে একটা মিটিং হল। ওরা বলল রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ তাই বদ্রীনাথ যাওয়া যাবেনা। বদ্রীনাথ গেলে আমাদের ১ দিন নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আমরা আগামীকাল ২৭/০৮/২০১৭ তারিখে গোবিন্দঘাট থেকেই পথ চলা শুরু করব। কিন্তু চিন্তার ভাঁজ কপালে, বৃষ্টি হচ্ছে এখনও। এই সব করতে করতে
রাত হয়ে গেল। রাত ১০ টার সময় পাশের হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে নিদ্রাগামী হলাম। আগামী দিন আমরা যাত্রা শুরু করব আমাদের বহু কাঙ্খীত পথের উদ্দেশ্যে।
২৭ তারিখ সকাল ৬ টা চা এসে হাজির। আগের দিনের বৃষ্টি আজ সকালে উধাও। আকাশ পরিষ্কার হয়ে সূর্যের দেখা মিলেছে। আমাদের আজ প্রথম দিনের হাঁটা শুরু হবে। আমরা ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। সামনেই এক জায়গায় প্রাতরাশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকাল ৮ টা পিঠে ব্যাগ তুলে বেরিয়ে পড়লাম। পিচের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম। মনোরম পরিবেশ। কিছুটা চলার পর থামলাম প্রাতরাশের জন্য। এখানে মালবাহক রা সবাই একসাথে হয়েছে। মনোজ জি ও এসছে আমাদের অভিযানের শুভকামনা জন্য। খাবার খেয়ে সবাই মিলে চলল ছবি তোলার পালা। দারুণ এক মুহূর্ত। উত্তেজনা তখন আরো বেড়ে গিয়েছে। বদ্রীনাথ যেতে পারিনি তাই দূর থেকেই জয় বদ্রীনাথ জয় মদমহেশ্বর ধ্বনি দিয়ে পথ চলা শুরু করলাম। অনেক মানুষ চলেছে বদ্রীনাথ দর্শন করতে, কেউ হেঁটে কেউ ডুলি তে। বদ্রীনাথের রাস্তায় ধ্বস নামার কারণে আমরা গোবিন্দঘাট থেকে হাঁটা শুরু করেছি। যাব পান্ডূকেশ্বর। যে পথ আমাদের গাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল সেই পথ পায়ে হেঁটে যেতে হচ্ছে। পান্ডূকেশ্বর থেকে গাড়ি ধরে যাব ক্ষীরাও নালার কাছে। যাই হোক পিচের রাস্তা এবার বা দিকে বাঁক নিয়ে উঠে গেছে উপরের দিকে। প্রথম দিন হাঁটা কষ্টকর, তাই ধীর গতিতে চলেছি। একটু চললেই হাঁপিয়ে উঠছি। বড় বড় গাছের সারির মাঝখান দিয়ে চড়াই পথ এঁকে বেঁকে উঠে গেছে। নীচ দিয়ে তীব্র গতিতে ভয়ে চলেছে অলকানন্দা নদী। কিছুক্ষন বসলাম সেখানে। আমাদের অন্য সদস্যরা এগিয়ে গেছে অনেকটা। সামনে পড়ল একটা গ্রাম, রামদানার ক্ষেত চারিদিকে। গ্রামের ভীতর দিয়েই পথ। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সেই ধ্বসা রাস্তা। ওই পথেই আমাদের আসার কথা ছিল গাড়িতে। ঘন্টা দুয়েক চলার পর পৌছলাম গাড়ি রাস্তায়। আমাদের অন্য সদস্যরা তখন গাড়ি করে চলে গেছে ক্ষীরাও নালার উদ্দেশ্যে। আমরা 5 জন অপেক্ষা করলাম গাড়ি ফেরার
মিনিট দশেকের মধ্যে গাড়ি চলে এল, আমরা গাড়িতে উঠলাম। ৩০ মিনিট গাড়িতে চলার পর আসলাম আমাদের সেই পথের সামনে। ক্ষীরাও নালা। এখান থেকে আমাদের আসল পথের শুরু। গাড়ি থেকে নেমে বাঁ দিকের পাথুরে রাস্তা ধরলাম। বড় বড় বোল্ডারে ভরে আছে চারিদিক। আমাদের গাইড প্রেম জি আর গুমান জি ও চলে এল। মালবাহকরা এগোতে শুরু করেছে । আমরা ও চলতে শুরু করলাম। আমাদের পথের বাঁ দিক দিয়ে বয়ে চলেছে ক্ষীরাও নালা। প্রচন্ড তার স্রোত। একের পর এক বোল্ডার টপকে চলেছি। সামনে পড়ল একটা ছোট ব্রীজ। ক্ষীরাও নালা পেরতে হবে এই ব্রীজের উপর দিয়ে। ব্রীজ টপকাতেই আরো একটা বোল্ডার জোন। আবার ভাঙতে হল বোল্ডার বিছানো রাস্তা। সামনে সবুজের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কিছুদুর এভাবে চলার পর হঠাৎ গোটা ভ্যালিটা মেঘে ছেয়ে গেল। শুরু হল বৃষ্টি। যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেই টাই জাঁকিয়ে বসল মনের মধ্যে। ব্যাগ থেকে পঞ্চু বের করে চাপিয়ে দিলাম। বৃষ্টির মধ্যেই পথ চলা, পথ ক্রমেই পিছল হয়ে উঠছে। চলতে খুব অসুবিধা হচ্ছে। ঘন্টা দুয়েক এভাবে চলার পর জঙ্গলের রাস্তায় প্রবেশ করলাম। বৃষ্টির কোন বিরাম নেই, জঙ্গলের পথ কাদায় পুরো মাখামাখি। ওই অবস্থাতেই পথ চলা। ঘন জঙ্গলে ঢাকা পুরো রাস্তাটা। সবুজের সমারহ। ঝি ঝি পোকার শব্দ আর নানা রকমের পাখির কোলাহল শুনতে শুনতে চড়াই উতরাই পথ অতিক্রম করছি। পথে দেখা হল ক্ষীরাও গ্রামের এক মানুষের সাথে। পিঠে বোঝা চলেছে দৈনন্দিন কাজে। ওনাকে জিঞ্জাসা করলাম ক্ষীরাও আর কতদুর? উনি বললেন 2 কিমি। ওনাকে বললাম এই গ্রামে কত লোক থাকে? বললেন দশ বারোটা পরিবার থাকে এখানে, কাজ বলতে মেষ পালন আর ওনার ঘোড়া আছে তিনটে। ঘোড়া গুলো উনি ভাড়ায় দেন মালপত্র বহনের জন্য।গ্রামের লোকেরা রোজ এই পথে ওঠে নামে। কী অদ্ভুত ওদের জীবন, সভ্যতার ছোঁয়া থেকে অনেক দুরে। সময় দুপুর দুটো, আরো এক ঘন্টা লাগবে আমাদের ক্যাম্পে পৌছাতে। কিছুটা চলার পর দেখা মিলল ক্ষীরাও গ্রামের, গ্রামের উপরেই দেখা যাচ্ছে আমাদের তাবু। আমাদের দেখে দৌড়ে এল গ্রামের কিছু বাচ্চা, ওদেরকে লজেন্স দিলাম। দেখা হল গ্রামের এক বয়ষ্ক মানুষের সঙ্গে, উনি প্রশ্ন করলেন কোথায় যাবেন? আমরা বললাম।
পানপাতিয়া। উনি তো শুনে চমকে গেলেন। বললেন খুব চড়াই রাস্তা আর খুব ভয়ংঙ্কর। আর বললেন উপরে প্রচুর বরফ। উনি আমাদের আশীর্বাদ করলেন। আমরা ওনাকে নমস্কার জানিয়ে ক্যাম্পের দিকে হাঁটা লাগালাম। ক্যাম্পে পৌছাতেই গরম চা, ভুজিয়া আর বিস্কুট যেন অমৃত। রোদের দেখা মিলল একটু। আমরা আমাদের তাবুতে ব্যাগ পত্র ঢুকিয়ে একটু বেরলাম ক্যামেরা নিয়ে। পথে অনেক পাখি দেখেছি, অন্তত একটা পাখির ছবি তুলতেই হবে। আমরা তিন জন একটা তাবুতে থাকব। আমি, গৌতম দা আর অমিতাভ দা। কিছুক্ষন পর ওয়েদার আবার খারাপ হয়ে গেল। ওদিকে ডিনারের আয়োজন চলছে। সন্ধা সাতটার সময় ডিনারের জন্য ডাক পড়ল। সবাই তাবু থেকে বেরিয়ে খাওয়া সেরে নিলাম। তারপর ঢুকলাম শুভজিত দাদের তাবুতে, আগামী দিনের পথ নিয়ে আলোচনা করলাম। চিন্তা হচ্ছে ওয়েদার নিয়ে। আলোচনা করে আমরা যে যার তাবুতে ঢুকলাম, তাবুতে ঢুকে কিছুক্ষন চলল আড্ডা। তারপর শুয়ে পরলাম এই ভেবে আগামী দিন যেন ওয়েদার টা পরিষ্কার পাই। রাত ৮ টার সময় নিদ্রাগামী হলাম।






