১৫ই অক্টোবর আমরা ৫ সদস্যের দল হৈ হৈ করতে করতে উঠে পড়লাম ট্রেনে। আমরা চলছি পশ্চিম সিকিমের গোচালা-র উদ্দেশ্যে। মনে প্রচন্ড উৎসাহ। 6 তারিখ সকালে পৌঁছে গেলাম নিউ জলপাইগুড়ি। জলযোগ সেরে আমরা উঠে পড়লাম শেয়ার জিপে। গন্তব্য জোরথাং। সকাল ৯টায় গাড়িতে উঠে জোরথাং পৌঁছতে বেলা হয়ে গেল। দুপুরের আহার সেরে আবার শেয়ার জিপে চললাম ইয়াকসাম। সন্ধ্যা 7 টা
নাগাদ পৌছলাম ইয়াকসাম। আমাদের গাইড আগে ই ঠিক করা ছিল। লামা জি। উনি সব ঠিকঠাক করে রেখেছেন। সারাদিনের গাড়ির ধকলে শরীর ক্লান্ত ও অবসন্ন। তাই দেরি না করে গুপ্তা জির হোটেলে রাতের আহার সেরে নিদ্রাগামী হলাম। পরে র দিন যাত্রা শুরু।
আজ আমরা যাব ইয়াকসাম থেকে সাচেন। পোর্টারা ও ইয়াক নিয়ে চলে এসেছে। আমরা সকালে র খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাচেনের উদ্দেশ্যে আর সাথে ইয়াকের গলার ঘন্টার ধ্বনি। অদ্ভূত এক সুর। পিচের রাস্তা একে বেকে উঠে গেছে উপরের দিকে। আধা ঘন্টার মনোরম যাত্রা র পর শুরু হল আসল রাস্তা। পিচের রাস্তা শেষ। জংগলে ঘেরা সুড়ি পথ উঠে গেছে উপরের দিকে। আজকে খুব বেশি হলে ৭কিমি হাঁটতে হবে আমাদের। প্রথম দিন একটু কষ্টকর হয়, তাই সাচেনকেই গন্তব্য ঠিক করেছি। পিছনে ইয়াকের ঘন্টা ধ্বনি আর পোর্টারদের শিসের আওয়াজ। নানারকমের পাখির আওয়াজ আর জঙ্গলে র সোদা গন্ধে মন প্রাণ জুরিয়ে গেল। এসে পড়লাম এক টা রক ফল জোনে। মনে হয় যেন এই বুঝি সব ধ্বসে পড়বে। অতি সাবধানে সেই রাস্তা অতিক্রম করলাম। আমরা প্যাক লাঞ্চ সঙ্গে নিয়েছিলাম। এসে পড়ল প্রথম সেতু। নীচ দিয়ে বয়ে চলছে খরস্রোতা নদী। সঙ্গে প্রবল হাওয়া। এখানেই আমরা লাঞ্চ সমাপ্ত করলাম। আর বেশি বাকি নেই। আরো আধঘন্টা চলার পর এসে পড়লাম সাচেন। গভীর জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট এক টা জায়গা। তাবু পতার জায়গা বেছে তাবু খাটালাম। ওদিকে গাইড রা রাতের আহারাদির জোগাড়ে বেস্ত। সব শেষ করে এবার ঘুমের পালা। কিছু দুরে আগুন জেলে দিলাম বন্য জন্তর ভয়ে। রাতে র জঙ্গলে র নানান রকমের আওয়াজ শুনতে শুনতে কখন যে চোখ বুজে এল বুঝতে ই পারি নি। সমাপ্ত হল প্রথম দিন।
দ্বিতীয় দিন...
সাচেনে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে রাতে বেলায়। আজকের আকাশ মোটমুটি পরিষ্কার। কিন্তু বৃষ্টি হয়াতে চলার পথ কাদায় ভরে গেছে। যেহেতু এ পথে ইয়াকের চলাচল বেশি তাই আর বেশি কাদা। সকাল 6 টায় ওঠার পর চা জল খাবার খেয়ে সব গুছিয়ে নিলাম। আজকে আমাদের গন্তব্য সোকা। সাচেনের উচ্চতা ছিল মোটামুটি 7200 ফিট। সাচেন থেকে সোকার দূরত্ব 6 কিমি মত। যেতে সময় লাগবে 5 থেকে 6 ঘন্টা । সোকার উচ্চতা 9600 ফিট মত। আমরা সকাল 7 টায় রয়না দিলাম সোকার উদ্দেশ্যে। জঙ্গলে ঘেরা পিচ্ছিল পথ উপরের দিকে উঠে গেছে। ঘন জঙ্গলে সূর্যের আলো ও ঠিকঠাক প্রবেশ করতে পারেনা। বৃষ্টি হয়াতে সব স্যাতসেতে হয়ে আছে। পিছনে ইয়াকেয় টুং টুং ঘন্টার আওয়াজ। গাইড কে বললাম জঙ্গল কাব তাক খতম হোগা'?? উত্তর এল জংরি তাক এসে হি চলেগা। হঠাৎ আমার পায়ের দিকে নজর গেল, দু দূটো জোঁক রক্ত খেয়ে ফুলে আছে। ছুরি দিয়ে তুলে ফেললাম দুটোকে। এ পথে জোঁকের দৌরাত্ব বেশি। উঠছি তো উঠছি, কোন ভিউ দেখতে পাচ্ছিনা। পায়ের তলায় কাদায় মাখা মাখি। এবার দমে একটু টান পড়ছে। উচ্চতা যত বাড়ছে অক্সিজেন মাত্রা তত কমছে। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌছলাম বাখিম। পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট চায়ের দোকান, আর নীচে নেমে গেছে গভীর খাদ। যতদুর দেখা যায় দিগন্ত বৃস্তিত ধোঁয়াটে পাহাড় শ্রেণী। চা পানের বিরতি। চায়ে চুমুক দিতে দিতে প্রকৃতির অদ্ভুত রূপ দেখছি। মন প্রাণ জুরিয়ে গেল। বাখিম থেকে আর ঘন্টা তিনেকের পথ। চা খেয়ে আবার শুরু পথ চলা। ইয়াক এগিয়ে গেছে আমাদের ফেলে। এবার চড়াই আর বেশি। খানিক টা এগচ্ছি আর দাড়িয়ে পড়ছি। বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে সেই সঙ্গে। আমাদের দলের এক সদস্য বলে উঠল বাবা আর কতদুর। আর দু ঘন্টা। শুনে ই বসে পড়ল। হাটছি আর বোল্ডারে হোচট খাচ্ছি। চলতে তো হবেই। কাঞ্চনজংঘা হাতছানি দিয়ে ডাকছে যে। তার দেখা না পাওয়া অবদি শান্তি নেই। এগিয়ে চললাম। গাইড বলল ও দিখাই দে রাহি হে সোকা। মনে বল পেলাম। হাঁটা র জোর টাও বেরে গেল, দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সোকা। একটা সুন্দর ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। আর অনেক দলের তাবু পড়েছে। এখানে প্রথম দেখা মিলল তুষার শুভ্র শৃঙ্গরাজীর। মাউন্ট পান্ডিম আর তার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আর অনেক শৃঙ্গ। সব ক্লান্তি র অবসান। সময় দুপুর 2 টো। বেলা যত বাড়ছে ঠান্ডা র প্রকোপ তত বাড়ছে। গরম চিকেন সুপ এসে হাজির। অমৃত পান করছি মনে হল। ওদিকে তাবু পাতার কাজ চলছে আর রাতের আহারের আয়োজন। আমরা ও হাত লাগালাম কাজে। এবার সূর্য অস্তগামী। শিখর চূড়া গুলো আস্তে আস্তে লাল হয়ে উঠছে। যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। অদ্ভুত মন ভোলান রূপ। সাথে গরম কফি আর পকোড়া। পাহাড়ের বুকে আধার নামছে ধীরে ধীরে, ঠাণ্ডা ও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। তাবুতে ঢুকে গেলাম আর জমিয়ে আড্ডা। রাতের খাবার ও রেডি। সন্ধ্যা 7.30 মিনিট নাগাদ খাবার পাট সমাপ্ত করে নিদ্রাগামী হলাম। হঠাৎ মেঘের আওয়াজ, আর শুরু হল বৃষ্টি। তাবুর নীচে দিয়ে জল ঢুকছে। সব ভিজে চিপচিপে। ঘন্টা খানেক চলল বৃষ্টি। আমাদের আর ঘুম হলনা সেরকম। কোনো রকমে রাত কাটিয়ে দিলাম। দ্বিতীয় দিনের সমাপ্তি।
তৃতীয় দিন:
সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। এখন সময় সকাল 6 টা। গাইড বেড টি নিয়ে হাজির। ঠান্ডা র চোটে স্লিপিং ব্যাগ ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। চা খেয়ে উঠে পড়লাম সবাই। আজকে আমাদের গন্তব্য সোকা থেকে ফেডাং পেরিয়ে জোংরি। জোংরির উচ্চতা প্রায় 12500 ফুট। আমরা এখন আছি 9600 ফুটে। 3000 ফুট উঠতে হবে। ১০ কিমি রাস্তা, পুরোটাই চড়াই। আজ এই ট্রেকের একটা কঠিনতম অংশ। আজকে রাস্তায় দুপুরে র আহার সারব। তাই প্যাক লাঞ্চ রেডি হচ্ছে। আমরা সকালের আহার সেরে পেক লাঞ্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আগের দিন রাতে বৃষ্টি হয়াতে রাস্তা খুব কাদা আর পিচ্ছিল হয়ে আছে। রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ গুলোকে মেঘ আর কুয়াশায় মিশে দৈত্যের মত দেখতে লাগছে। সব মিলিয়ে এক আধো আবছায়া পরিবেশ। দম ধরে রাখা যেন দায়। নিঃশ্বাস আর প্রসাশ্বের তুমুল লড়াই চলছে। একের পর এক বোল্ডার টপকাতে হচ্ছে। পিছনে ইয়াকের গলার ঘন্টার আওয়াজ। কত বার যে আছার খেয়েছি ঠিক নেই। আমি অনেক টা এগিয়ে গেছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে গাইড বলল কয়ি গির গায়া। আমি দৌড়ে নীচের দিকে নামলাম। দেখলাম আমাদের এক সদস্য মাথা নীচু করে পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে। কি হয়েছে প্রশ্ন করতে বলল প্রচন্ড মাথা ব্যাথা বমি বমি ভাব আর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুঝলাম এ এম এসে ভুগছে। একটা ঔষধ দিলাম। সে বলল আমি এত দুর এসছি যখন যাব ই। উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটা আরম্ভ করে দিল। আবার হাঁটা শুরু। কুয়াশা টপ টপ করে পড়ছে গাছের উপর থেকে। উচ্চতা জনিত কারণে আমার মাথা ও ধরে আছে। ফেডাং আর বেশি দুর নয়। অনেক বিদেশি দের নামতে দেখছি। এ পথে বিদেশি দের আধিক্য বেশি। আধঘন্টার মধ্যে চলে এলাম ফেডাং। পুরো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে চারিদিকে। কিছু দেখা যাচ্ছে না। প্রচন্ড ঠান্ডা অনুভব করলাম এখানে। এখানে আমরা লাঞ্চ সেরে নিলাম। এখান থেকে একটা রাস্তা ডানদিকে গিয়ে কোকচুরাং এ মিশেছে। আর একটা সোজা উপরে দিকে জোংরি তে। আমরা সোজা রাস্তা টা ধরলাম। এ পথে গাছের উপরে বরফের আস্তরন দেখলাম। মেঘ আর সরছেনা। এখনো তিন ঘন্টা হাঁটতে হবে আমাদের। বড় গাছ এখানে অনেক কম। ছোট ছোট বুনো গাছ ভরে আছে রাস্তার পাশে। বুঝলাম আমরা এখন অনেক উচ্চতা য় এসে গেছি। একটু এগচ্ছি আর দাঁড়িয়ে পড়ছি। আকাশ কিছু টা পরিষ্কার হল। এখন রাস্তা কিছু টা সমান। তাই আমরা জোরে পা চালালাম। সময় 3 টে। এখনও 1 ঘন্টা যেতে হবে। গাইড বলল ইহাসে রাস্তা আচ্ছা হে, উতনা চড়াই নেহী হোগা। আপ লোগ জলদি চলিয়ে। কিছু দুর চলার পর একটা টিনের চাল দেখতে পেলাম, মনে বল পেলাম। অনেক দলের তাবু এখানে। অবশেষে পৌছে গেলাম জোংরি। ইয়াক আমাদের অনেক আগেই এসে হাজির। তাবু ও রেডি হয়ে গেছে। গরম সুপ ও এসে গেল। কাল আমাদের রেষ্ট ডে। কাল সকালে যাব জোংরি টপে। তাই বেশি দেরি না করে রাতে র খাবার খেয়ে তাবুতে ঢুকে পড়লাম।
চতুর্থ দিন:
আজকে আমাদের বিশ্রাম এর দিন। আগের দিন অনেক টা উচ্চতা উঠতে হয়েছে। তাই উচ্চতা আর পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খায়িয়ে নিতে আজ রেষ্ট। আজ যাব জোংরি টপে। উচ্চতা 13500 ফুট মত। সূর্যদয় দেখব বলে ভোর বেলা উঠে পড়েছি। চা খেয়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম জোংরি টপের উদ্দেশ্যে। জোংরি থেকে দেখা যায় জোংরি টপ। হালকা চড়াই রাস্তা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে গেছে। শীতল হাওয়া শরীর ছুয়ে যাচ্ছে। তখনও আলো ফোটেনি। দুরে দেখা যাচ্ছে জোংরি টপের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ। যত উঠছি ঠাণ্ডা টের পাচ্ছি তত। ছোট ছোট ঘাসে ঢাকা সরু পথ উপরের দিকে উঠে গেছে। ঘন্টা খানেকের মধ্যে চলে এলাম জোংরি টপে। আস্তে আস্তে লাল আভায় পরিপূর্ণ হচ্ছে শীখর চূড়া গুলো। আমরা সবাই পূজা দিলাম এখানে। হিম শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে শোঁ শোঁ শব্দে। সামনে লাল আভায় উদ্ভাসিত কাঞ্চনজংঘা, কাবরু, রাথং আরো কত। সে দৃশ্য চীর জীবন মনের মণীকোঠায় জীবন্ত হয়ে থাকবে। কিছু সময় ধরে চলল ফটো তোলা। 1 ঘন্টা কাটানোর পর এবার নামার পালা। ধীরে ধীরে নেমে এলাম জোংরি ক্যাম্প সাইডে। আমার মন মানল না। আবার যাবো দুপুরে র খাওয়া সেরে আর একটু রেষ্ট নিয়ে। কেউ যেতে রাজি হলনা। খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে একাই চললাম জোংরি টপের দিকে। বেলা বারার সাথেই মেঘের আনাগোনা বাড়তে লাগলো। 3 টের সময় আবার হাজির জোংরি টপে। মেঘ রদ্দুরের লুকোচুরি খেলা চলছে এখন। নীচে যতদুর দেখা যায় সোনালী ঘাসের বুগিয়াল। বাঁ দিকে কাঞ্চনজংঘা বেস ক্যাম্প যাওয়ার রাস্তা। আমাদের কালকে র পথ দেখা যাচ্ছে। বুগিয়াল ভেদ করে চলে গেছে সোজা। কাঞ্চনজংঘা আর তা র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক শৃঙ্গ। কখনও মেঘের আড়ালে যায় আবার উঁকি মারে। একা বসে আছি এই অতি মনোরম একটি জায়গায়। উঠতে ইচ্ছা করছেনা তাও নামতে হবে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এ ভাবেই সারাদিন কেটে গেল। রাতে তাবুতে চলল জোরদার আড্ডা আর গান। কখন সময় কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। 9 টার সময়।রাতে র আহার সেরে নিদ্রাগামী হলাম।
পঞ্চম দিন:
আগের দিন রাতের বেলা য় তাপমাত্রা র পারদ -5 ডিগ্রী তে নেমে গেছিল। গাইড সকাল 5.30 বেড টি নিয়ে হাজির। গাইড কে প্রশ্ন করলাম মৌসম কেসা হে??? উত্তর এল বহত বড়িয়া জি! আব লোগ জলদি নিকলো নেহিতো মৌসম বিগাড় যায়েগা। আগের দিন বিশ্রাম নেওয়া তে আজ শরীর তরতাজা। আজকে আমাদের গন্তব্য জোংরি থেকে কোকচুরাং হয়ে থানসিং। সকাল 6.30 এর মধ্যে আমরা জল খাবার খেয়ে রেডি হয়ে গেলাম। গাইড বলল আপ লোগ চলিয়ে মে সামান প্যাক কারকে আ রাহা হু। আমরা জোংরি কে বিদায় জানিয়ে আজকের যাত্রা শুরু করলাম। আধ ঘন্টার একটা ছোট্ট চড়াই ভাঙতেই চোখের সামনে খুলে গেল দিগন্ত বৃস্তিত সোনালি ঘাসের বুগিয়াল। সামনে ব্ল্যাক কাবরু, যেন কেউ আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে তার তার গা। ডানদিকে তাকালে ই মাউন্ট পান্ডিমের বরফ শীখর। ঠান্ডা বাতাস আর হালকা মিঠে রোদ গায়ে মেখে হেটে চলেছি বুগিয়ালের উপর দিয়ে। কি মনোরম দৃশ্য। পিছনে ইয়াকের সেই ঘন্টা র শব্দ। ইয়াকসাম থেকে জোংরি অবদি যে পথ ধরে এসছিলাম সে পথের সাথে এ পথের বিস্তর ফারাক। এখানে প্রকৃতি সব কিছু উজার করে দিয়েছে। কিন্তু পিছনের ফেলে আসা পথ অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। এ পথের সৌন্দর্য বলে বোঝানো যাবেনা। শুধু খোলা ময়দান। আমরা ঘন্টা দুয়েক মত হেঁটেছি। পথে পড়ল এটা পাহাড়ী ঝোড়া। ঝোড়া টপকাতেই চক্ষু চরকগাছ!! একটা প্রানান্তকর বোল্ডারের রাস্তা এঁকে বেঁকে নেমে গেছে 300 থেকে 400 ফুট নীচে কোকচুরাং এ। শুরু হল নামার পালা। এক টা করে বাঁক ঘুরছি আর মনে হচ্ছে হাঁটু র মালাইচাকি খুলে আসবে। এ ভাবেই আধ ঘন্টা চলার পড় নেমে এলাম কোকচু্রাং এ আর গা এলিয়ে দিলাম পাথরের গায়ে। পায়ে কোন সাড় নেই। পাস দিয়ে বিরাট গর্জনে এগিয়ে চলেছে ফা খোলা নদী। বড় পাথর গুলোকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। খানিক বিশ্রাম এবং সঙ্গে থাকা ছাতু খেয়ে শুরু হল হাঁটা। বড় বড় বোল্ডারের উপর দিয়ে পথ নদী পেরিয়ে চলে গেছে ওপারে। আবার বড় গাছের অধিক্য বেড়ে গেল। এখন সময় দুপুর 2 টো। আর 2 থেকে 3 ঘন্টার পথ। জঙ্গলে র মধ্যে দিয়ে উঁচু নিচু পথ গিয়ে মিশেছে থানসিং এ। পথে দেখা এক মেষ পালকের সঙ্গে। বললাম ইহাসে কিতনা দুর হে থানসিং?? 2 ঘন্টা ওর লাগেগা। ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলা শুরু। এ ভাবেই এক ঘন্টা চলার পড় বড় গাছের ঘনত্ব কমে এল। গাইড আমাদের ইশারায় আঙুল দেখিয়ে বলল ওই যে দেখা যাচ্ছে থানসিং। না না রঙের তাবু দেখা যাচ্ছে দূর থেকে। আমরা পা চালালম আর জোরে। বিকেল 4 টে নাগাদ এসে পৌছলাম থানসিং। সামনে বিশাল থানসিং ভ্যালি ডানদিকে পান্ডিম যেন একেবারে গায়ের উপরে পড়বে। ভ্যালি জুরে ভেড়ার দলের দাপাদাপি। আর বাঁ দিকে সেই ব্ল্যাক কাবরুর পোড়া গাত্র খাড়া উঠে গেছে। তার ঠিক নিচে দিয়ে বয়ে চলছে ফা খোলা নদী, যেটা কোকচুরাং এ মিশেছে। এ সব দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সন্ধ্যায় চলল পকোড়া খাওয়া আর জমিয়ে আড্ডা। তাপমাত্রা র পারদ - 6 ডিগ্রি। হাড় কাপানো ঠাণ্ডা। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সাঙ্গ করে ঠান্ডা য় কাঁপতে কাঁপতে তাবুতে ঢুকে গেলাম।
ষষ্ঠ দিন:
প্রচন্ড ঠান্ডায় ঠিক মত ঘুম হয়নি। আমরা আজকে ঘুম থেকে উঠলাম দেরিতে। সকাল 8 টার সময় তাবু ছেরে বেরলাম। ঝকঝকে নীল আকাশ, সামনে থানসিং ভ্যালি আর ডান দিকে পান্ডিম শীখর চূড়া। আজ আমরা যাব লামুনে। আমরা এখন আছি 13000 ফুট উচ্চতায়। লামুনের উচ্চতা 13800 ফুট মত। ঝকঝকে সকালে রোদ গায়ে মেখে বেরিয়ে পোড়লাম লামুনের উদ্দেশ্যে। আজকের পথ মসৃণ। সামনে দেখা যায় কাঞ্চনজংঘার একটা অংশ। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হল তুষার পাত। সবাই আনন্দে আত্মহারা। সে এক অসাধারন মুহূর্ত। পথে অনেক পাহাড়ি ঝোড়া পড়ছে। পান্ডিম সবসময় আমাদের সাথে। কিছু টা চড়াই ভাঙার পর দেখা গেল লামুনে। উঁচু উঁচু সোনালী ঘাসে ভরে আছে পুরো ভ্যালিটা। বাতাসের ছন্দে ঘাসের মাথা গুলো দুলছে। কিছুটা চলার পর দেখা পেলাম ভাড়াল দের। অবলিলায় চরে বেরাচ্ছে ঘাসের ময়দানে। কি অপরূপ দৃশ্য। 4 ঘন্টার মধ্যে পৌছলাম লামুনে। এবার কাঞ্চনজংঘা স্বমহিমায় বিরাজমান। আর পাশে পান্ডিম। চলে এল গরম চা। গরম পেয়ালায় চুমুক আর মন ভরে প্রকৃতির রূপ দেখছি। কখনও মেঘ এসে ঢেকে দেয় আবার পরক্ষনেই ঝলমলে রোদ, আর তার সঙ্গে ভাড়াল আর তার শাবকদের খেলা। সারা দিন এদিকে ওদিকে ঘুরে কাটিয়ে দিলাম। প্রচুর ছবি তুললাম। পুরো ছবির মত সাজানো জায়গা। কাল আমাদের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে সারা শরীর। গাইড বলল কাল রাত দো বাজে নিকালনা পারেগা, সব তৈয়ারি কার লো। এই লামুনে হল মাউন্ট পান্ডিমের বেস ক্যাম্প। ইয়াক আর যাবেনা এখান থেকে। সব মালপত্র এখানেই রেখে গোচা-লার পথে যেতে হবে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। আমরা তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে তাবুতে ঢুকে নিজেদের দরকারি কিছু জিনিস একটা ছোট ব্যাগে নিয়ে নিলাম। সঙ্গে ড্রাই ফুড। কালকে এ পথের সবথেকে কঠিন রাস্তা। লামুনে থেকে সমিতি লেক পেরিয়ে গোচা-লা দেখে আবার এখানে ফিরে কোকচুরাং নেমে যেতে হবে। সন্ধ্যা 7 টায় শুয়ে পড়লাম। ঘুম আর এলনা, দু চোখে শুধু স্বপ্ন। আগামী র অপেক্ষা।
শেষ দিন:
তখন সময় রাত 1.30 ।তাবুর বাইরে গাইড গরম কফি নিয় হাজির। তাপমাত্রা -10 ছুঁই ছুঁই। কোন রকমে বেরলাম তাবুর মধ্যে থেকে। বেরিয়ে ই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। সারা শরীর জুরে হিমেল হাওয়া খেলে গেল। জোৎস্না স্নাত গোটা ভ্যালিটা, আর সামনে চাঁদের আলোয় আলোকিত পান্ডিমের শীখর। এ দৃশ্য মন ক্যামেরায় চিরজীবন ভাস্মর হয়ে থাকবে।রাত 2 টোর সময় লামুনে থেকে বেরোলাম গোচা-লার উদ্দেশ্যে। মাথায় হেড ল্যাম্প।হাড় হিম করা ঠান্ডা। মোরেন বিছান রাস্তা উপরের দিকে উঠে গেছে। আধ ঘন্টা চলার পর শুরু হল প্রানান্তকর চড়াই। এখানে অক্সিজেন মাত্রা অনেক কম। তাই একটু হাটলেই হাঁপিয়ে উঠছি। রাস্তা খুবই শুরু , একটু পা পিছললেই সোজা নীচে। হঠাৎ কানে এল স্রোতের আওয়াজ। কিসের আওয়াজ হচ্ছে ওটা??? না কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। গাইড বলল সমিতি লেক আ গায়া। সমিতি লেকের উচ্চতা 15700 ফুট। রাতের অন্ধকারে দেখতে পেলামনা সমিতি লেককে। সমিতি লেকে পৌছাতে আমাদের সময় লাগল 3 ঘন্টা। এখান থেকে আর এক ঘন্টা গেলে গোচালা প্রথম ভিউ পয়েন্ট। ভোর সাড়ে চারটে, অল্প আলোয় নজরে এল চারিদিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলেছে অজস্র শীখর চুড়া। হঠাৎ একজন বলে উঠল ঐ দেখ কে টরচ মারছে উপর থেকে। সবাই একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। বলে উঠলাম টরচ!!! কোথায়??? না আমাদের চোখের ভুল। ওটা টরচের আলো নয়, ভোরের শুকতারা। আস্তে আস্তে আলো ফুটতে লাগল। সামনে কাঞ্চনজংঘার শীখর দেখা যাচ্ছে। ছোট বড় বোল্ডার টপকে এসে দাঁড়ালাম ভিউ পয়েন্ট 1 এ। হাত পা জমে বরফ। য়নের জোরে এতদু্য উঠে আসা। একে একে কখঞ্চনজংঘা, কূম্ভকরণ, পান্ডিম, নরসিং, কাবরু আর কত সব রক্তিম রূপ ধারন করল। ওই দৃশ্য দেখে আমরা আর আবেগ চেপে রাখতে পারলাম না। প্রকৃতি মা সহায় না হলে আমরা এরকম দৃশ্য দেখতে পেতাম না। ভিউ পয়েন্প 1 থেকে আমাদের সোজা নেমে যেতে হবে 100 ফুট নীচে জেমাথাং ভ্যালিতে। প্রচন্ড ঠান্ডা আর দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটা আরম্ভ করলাম। পথ বললে ভুল হবে, কোন রকমে হামাগুড়ি দিয়ে নেমে এলাম জেমাথাং এ। কানে এল বিকট আওয়াজ। কাঞ্চনজংঘার বুক থেকে খসে পড়ছে টন টন বরফ। কি বিভৎস!!! গাইড আমাদের আওয়াজ করতে বারণ করে দিল। একটু কম্পনে ঘটে যেতে পারে বড় বিপদ। বিরাট ভ্যালি, আর তাকে ঘিরে রেখেছে অজস্র শৃঙ্গ। পা রাখলাম জেমাথাং এ। দেখলে মনে হয় সাদা বালির ভ্যালি। পা রাখতে ই কড়মড় শব্দ, বুঝলাম শুকনো বরফ। য়নে হয় যেন কোন বালিয়াড়ির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি। "ভ্যালি অফ সাইলেন্স"। মনে হচ্ছিল আমরা পৃথিবীর বাইরে অন্য কোন জগতে আছি। আমরা এখন অনেক কাছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে র। আর একঘন্টা চলতে হবে। সামনে পড়ল একটা রিজ। এক দেড় ফুটের মত শুরু রাস্তা চলে গেছে রিজের উপর দিয়ে। ছোট ছোট পাথরে ভরে আছে রিজটা। দুরু দুরু বুকে উঠে পড়লাম রিজের উপর। রিজের দুপাশে গভীর খাদ। পা ফসকালেই একেবারে 200 ফুট নীচে। অতি সাবধানে চলতে লাগলাম। হাতে পায়ে কোন সাড় নেই। নিজের খেয়ালে হেঁটে চলেছি। আধ ঘন্টা চলার পর আমরা হতবাক হয়ে গেলাম। দেখা যাচ্ছে একটা নীল জলরাশি আর তাকে আগলে রেখেছে সব শীখর চুড়া। বিস্ময় শুধু বিষ্ময়। একে অপরকে জরিয়ে ধরলাম। আমরা পেরেছি। দু চোখ ভরে শুধু দেখছি প্রকৃতি মায়ের সৌন্দর্য। ফিরে যেতে তো মন চায়না, গাইড বলল ইহাপে যাদা দের মত রুকিয়ে। গাইডের কথা মত গোচালা কে শেষ বারের মত দেখে নিয়ে ফিরে চললাম। গোচালার উচ্চতা 16200 ফুট মত। রিজ লাইন পেরিয়ে জেমাথাং ক্রস করে উঠে এলাম ভিউ পয়েন্ট 1 এ। এখান থেকে আর একবার দেখে নিলাম কাঞ্চনজংঘার অপার সৌন্দর্য। এখান থেকে কিছু টা যাওয়ার পর ভাবলাম আমরা কি এ পথেই উঠেছিলাম, গাইডকে বললাম। গাইড মুচকি হেসে বলল ও হি হে সমিতি লেক। রাতে র অন্ধকারে যেটা দেখা যায়নি এখন সেটা দেখে নিলাম। কি ভয়ানক পথ। একটু পা পিছললেই সমিতি লেকের হিম শীতল জলে। ভাবলেই অবাক লাগছে আমরা রাতে এই পথে উঠেছিলাম। নেমে এলাম সমিতি লেকে। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে ফিরে চললাম লামুনের পথে। দুপুর 1.30 মিনিট এসে পৌছলাম লামুনে। এসেই লুটিয়ে পড়লাম ঘাসের উপর। সব শক্তি শেষ। গরম সুপ চলে এল। আজ আমাদের ফিরে যেতে হবে কোকচুরাং এ। দেরি নি করে উঠে পড়লাম। শেষ বারের মত কাঞ্চনজংঘাকে দেখে নিলাম। মন যে চায়না, কোকচুরাং ফিরতে রাত হয়ে গেল। এখানে রাত কাটিয়ে যে পথ ধরে উঠেছিলাম সেই পথেই আবার ফিরে চলা। আবেগ কেউ আর চেপে রাখতে পারলাম না। জরিয়ে ধরলাম গাইডদের। ওরা না থাকলে এসব সম্ভব হতনা। শেষ বারের মত ইয়াকসামকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠলাম। গাইড বলল ফিরসে আনা সাব!!! ওদের আতিথেয়তা ভোলার নয়। আজ রাতের ট্রেনে ফিরব কোলকাতা। আবার এক বছরের অপেক্ষা।
,........... সমাপ্ত। .....…..........