Wednesday, April 29, 2020

রূপকূন্ডের অন্দরে



2013 সালের 5 ই অক্টোবর আমরা 5 সদস্যর দল চলেছি গাড়োয়াল হিমালয়ের রূপকূন্ড। রাত ১১ টার ট্রেন। মনে প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে উঠে পড়লাম কাঠগোদাম এক্সপ্রেস এ। একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে 7 তারিখ সকাল 6 টায় ট্রেন এসে থামল কাঠগোদাম। এক বছরের অবসান, আবার চলেছি পাহাড় দেখতে। আবার সেই গহন অরণ‍্য, সেই রাতের নিস্তস্ভতা। ভেবেই মন জুরিয়ে গেল। আমাদের গাইড নন্দু জি আগেই তার সাথে কথা বলা ছিল। সেই অনুযায়ী সে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে স্টেশনে‌। সামান্য জলযোগ করে মালপত্র সব গাড়িতে তুলে বেরিয়ে পরলাম লোহাজং এর উদ্দেশ্যে। গাড়ি চলছে তার নিজস্ব ছন্দে। গাড়ি একটা করে বাঁক নিচ্ছে আর সামনের চিত্র গুলো বদলে যাচ্ছে। যত দূর দেখা যায় ধোয়াটে সবুজে ভরা পাহাড় শ্রেণী। ঘন্টা দুয়েক চলার পর গাড়ি থামল ব্রেকফাস্টের জন্য। আধ ঘন্টা র মধ্যে খাওয়া সেরে উঠে পড়লাম  গাড়িতে। আবার পাহাড়ের আঁকা বাঁকা পথ। এবার গাড়ি থামল কৌশানি। দুপুর 1 টা। এখানে আমরা সব লাঞ্চ করব। কৌশানি অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা। পাশ থেকে আমার সাথী বলে উঠল ঐ দেখ ত্রিশূল দেখা যাচ্ছে। সত্যি তাই। আহা!!!! আমরা তো যাব তার কাছেই। একটু ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাওয়া শেষ করলাম। আবার উঠে পড়লাম গাড়ি তে। আমরা এখন যাব গোয়ালদামে। ওখানে আমাদের গাইড অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। গাড়ি চলেছে গোয়ালদামের উদ্দেশ্যে। বিকেল 4 টে নাগাদ পৌছালাম গোয়ালদাম। 
দেখলাম নন্দু জি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামতেই নমস্তে বলে জরিয়ে ধরলো। নন্দু জির সাথে আরো 4 জন। । এই কদিন আমরা একটা পরিবার। সবাই গাড়িতে উঠে বেরিয়ে পোড়লাম লোহাজং এর উদ্দেশ্যে। গাড়িতে চলল আড্ডা। সন্ধ্যা 6 টা নাগাদ পৌছলাম লোহাজং। এখানে পৌঁছে ঠান্ডা ও টের পেলাম একটু। হোটেল আগেই ঠিক ক‍রে রেখেছে নন্দু জি। মালপত্র নামিয়ে ঢুকে পরলাম হোটেলে। বেশি দেরি না করে পাশের হোটেলে রাতের খাওয়া সাঙ্গ করলাম। রাতে সবাই একটা ছোট টিম মিটিং করলাম। সারাদিন গাড়ির ধকলে শরীর খুবই ক্লান্ত। কাল আমাদের যাত্রা শুরু। মনে চরম উদ্দিপনা নিয়ে আগামীর অপেক্ষা।

প্রথম দিন:
আগের দিন রাতের বেলায় নন্দু জির কাছে শুনেছিলাম নন্দা রাজ যাত্রা র কথা। প্রত‍্যেক বারো বছর অন্তর হয় সেই যাত্রা। গাড়োয়াল হিমালয়ের দূর দূরান্তের গ্রাম থেকে হাজার হাজার অভিযাত্রী অংশ নেয় সেই যাত্রায়। শোনা যায় বারো বছর অন্তর নাকি ওই অঞ্চলের কোন এক গ্রামে জন্ম হয় চার শিং ওয়ালা ভেড়ার। সেই ভেড়াকে সঙ্গী করা হয় এই উৎসবে। এই যাত্রা শেষ হয় হিমালয়ের প্রত‍্যন্ত জায়গা হোমকূন্ডে। তারপর সেই ভেড়াকে ছেরে দেওয়া হয় সেখানেই সে আর ফিরে আসেনা। হারিয়ে যায় হিমালয়ের গহনে। সকালে নন্দু জির ডাক, চা পি লি জিয়ে। আমরা চা খেয়ে গেলাম পারমিশনের জন্য। গাইডরা মালপত্র গোছাতে ব‍্যাস্ত‌ । পারমিসন তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। আজ আমরা যাব লোহাজং থেকে কুলিং হয়ে দিদিনা। কুলিং অবদি গাড়িতে যাব। এখানে বলে রাখা ভাল রূপকূন্ড যাওয়ার দুটি রাস্তা আছে। একটি রাস্তা কুলিং থেকে সোজা ওয়ান গ্রাম থেকে ঘরোলি পাতাল, বৈদিনি বুগিয়াল হয়ে রূপকূন্ড, আর আরেকটি আমাদের রূট। দিদিনার উচ্চতা 8000 ফুট। সকাল 8 টা গাড়ি এসে হাজির। মালপত্র সব তোলা হল গাড়িতে। গাড়ি আমাদের ছেড়ে দেবে কুলিং। নন্দা মায়ের জয়ধ্বনি দিয়ে যাত্রা র সূচনা করলাম। 45 মিনিটের মধ্যেই আঁকা বাঁকা পথ পেরিয়ে পৌছলাম কুলিং। কুলিং থেকে ডানদিকে আমাদের রাস্তা। মালপত্র নামিয়ে ৯টা নাগাদ আমাদের হাঁটা শুরু। মনে প্রবল উদ্দিপনা। জঙ্গলে ঘেরা ঘন সবুজ গহণ অরণ‍্য। চোখ জুরিয়ে যায়। এই টুকু শান্তির জন্যে বার বার ছুটে আসা হাজার বাঁধা অতিক্রম ক‍রে। পথ হেঁটে চলছি হঠাৎ নজরে এল একজন বয়ষ্ক ব‍্যাক্তি পিঠে ব‍্যাগ নিয়ে উঠে আসছে উল্টো দিক থেকে। উনি বললেন রূপকূন্ড যাবার রাস্তা কোনদিকে। আমরা অবাক হলাম!! ওনার সাথে কোন গাইড নেই। সম্পূর্ণ একা। বুঝলাম উনি পথ ভুল করেছেন। আমরা ওনাকে আমাদের সাথে যেতে বলাতে উনি রাজি হয়ে গেলেন। আর একজন সঙ্গী বেড়ে গেল। গল্পের ছলে হেঁটে চলেছি আর জঙ্গলে র অপরূপ শোভা দেখছি। পথের মাঝে একটা আগাছা ভরা জায়গা সেটা পেরতে যাব কি একটা যেন আমার পথের এক সাথীর পায়ের উপর দিয়ে পাশের ফাটলে ঢুকে গেল। আমার বন্ধু বলল একটা বিষধর সাপ। কি ভয়ানক!! আমরা ছবি নিলাম কিছু। কামড়ালে এক ছোবলে ছবি। আবার হাঁটা শুরু হল। কয়েকটি ঝোড়া পড়ল পথের মাঝে। কয়েকটি ঝরনা দেখলাম অঝর ধারায় ঝরে পড়ছে পাহাড়ের উপর থেকে। কি অপরূপ দৃশ্য। নানান রকমের পাখির আওয়াজ, এ সব দেখতে দেখতে 4 ঘন্টার মধ্যে পৌছলাম দিদনা। এখানে রামদানার ক্ষেত দেখলাম, কিছু ঘর বাড়ি ও আছে। দুর থেকে দেখা গেল আমাদের তাবু। একটা খালি মাঠের মত জায়গা। গাইডরা আগে এসে রান্না শুরু করে দিয়েছে। আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে ওদের সাথে হাত লাগালাম কাজে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, রাতের প্রাণীরা জেগে উঠছে ধীরে ধীরে। রাতের আকাশে অসংখ্য নক্ষত্র। কি অসাধারণ দৃশ্য। আগামী কাল যাব আলী বুগিয়ালের পথে। কালকের পথ অনেকটা চড়াই। তাই আর দেরী না করে রাতের খাবার শেষ করে নিদ্রাগামী হলাম।

দ্বিতীয় দিন:

সকাল নন্দু জি চা এনে হাজির। বাইরে অসাধারণ আবহাওয়া। পেঁজা তুলো মত মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। হিমেল হাওয়া মন প্রাণ জুরিয়ে যাচ্ছে। গাইড‍রা প্রাতরাশের আয়োজন করছে। আমরা তাবু তুলে মালপত্র প‍্যাক করে নিলাম। গরম ম‍্যাগি পরিবেশন করল গাইডরা। এবার বেরনোর পালা। আজ আমরা যাব আলী বুগিয়াল। উচ্চতা 11300 ফুট। আমাদের প্রায় 3000 ফুট উঠতে হবে আজ। পথ চলা শুরু করলাম। ওক গাছের সারি আর তার মাঝখান দিয়ে খাড়া পথ। মাঝে পড়ল তোলপানি নামে একটা ছোট্ট জায়গা কয়েকটি পরিবারের বাস সেখানে। ওরা মূলত পশু পালন করে। কিছু দুর চলার পর গা টা গুলিয়ে উঠল। যা খেয়েছিলাম সব বেরিয়ে গেল। জানিনা হঠাৎ কি হল!!! আমার সহযাত্রিরা ভয় পেয়ে গেল। ওরা বলল চল দিদনা ফিরে যাই, তখন আমরা 1.30 মিনিটের পথ অতিক্রম করেছি। সামনে ওক বনে ঘেরা বড় বড় বোল্ডার ফেলা রাস্তা সোজা উঠে গেছে উপরে। আমি ওদের বললাম না আমি যাব। আবার চলতে লাগলাম। আবার কিছু দুর গিয়ে এক অবস্থা। জল খাচ্ছি সেটাও বেরিয়ে যাচ্ছে। কোন রকমে আলী বুগিয়াল পৌছাতেই হবে। 1 ঘন্টা চলার পর ঘন বনের সংখ্যা কিছু কমে এল। গাইড বলল থোড়া ওর চলনেসে আলী বুগিয়াল মিলেগা। মনের জোর বেরে গেল কিছুটা‌। একটা ফাঁকা জায়গায় বসলাম কিছুক্ষন। আবার চলা শুরু করলাম। কিছু দুর চলার পর দেখলাম চির সবুজে ভরা বিশাল ময়দান। যেন কেউ বিছানা পেতে রেখেছে আমাদের জন্য। যতদুর চোখ যায় শুধু সবুজ। আমার অনেক টা পিছনে আমার দুই সঙ্গী। ওরা বলল তোরা এগিয়ে যা, আমরা আসছি। পা রাখলাম বুগিয়ালে। সে এক আশ্চর্য অনুভব। গাইডরা এগিয়ে গেছে অনেকটা। আমি আর আমার বন্ধু অরিত্র তখন বুগিয়ালের মাঝখানে। পিছনে তাকিয়ে হাত নাড়ালাম দুই সঙ্গী র উদ্দেশ্যে। ওরা আবার বলল এগিয়ে যা। হঠাৎ সামনে নজর যেতেই দেখি কিছু ই দেখা যাচ্ছে না। পিছনে তাকালম না কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো। ঘন মেঘের কুন্ডুলি, হিমেল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে সোঁ সোঁ শব্দে। আমরা আর এগতে পারলাম না। আমি আর অরিত্র বসেৎপড়লাম একটা ঢিবির উপ‍র। ওরা দুজন তো আসছেনা!!!! গাইডদের ও দেখা নেই। সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। শুরু হল টিপ টিপ করে বৃষ্টি। ঠান্ডা তে হাত পা জমে যাচ্ছে। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। কতক্ষণ বসে থাকব এই পরিবেশে। 1 ঘন্টা পর পর চিন্তিত মুখে গাইডরা এসে হাজির। কেয়া হুয়া????ও দোনো আভি তাক নেহি আয়া। ওদের মুখ ফেকাশে হয়ে গেল। আমরাও ভয় পেলাম। ততক্ষনে ওয়েদার অনেক পরিষ্কার হয়ে এসেছে। গাইড বলল আপ লোগ ইহাপে রাহো মে আ রাহা হু। বলেই চলে গেল। মনের মধ্যে অজানা আতঙ্ক। আধ ঘন্টা পর দেখি তিনজন মানুষ হেঁটে আসছে এদিকে অপেক্ষার অবসান হল। হাঁপ ছেরে বাঁচলাম। গাইড বলল গলত রাস্তে পে চলা গায়া থা। দুরে দেখা যাচ্ছে আমাদের আজকের ক‍্যাম্প। শরীর খুব ই ক্লান্ত। আরো দুরে দেখা যাচ্ছে ত্রিশূল চূড়া। সব ক্লান্তি র অবসান এক লহমায়। কিছুক্ষন বসে থাকলাম একাকী। আঁধার ঘনাচ্ছে ধীরে ধীরে। ত্রিশূলের রং ও বদলাচ্ছে ধীরে ধীরে। পিছনে ফিরে তাকালাম বুগিয়ালের দিকে। মেঘ রদ্দুরের লুকোচুরি সারা বুগিয়ালে। এবার তাবুর দিকে রওনা দিলাম। গরম সুপ পেলাম হাতে। গাইডরা রাতে র আহারের আয়োজন করছে। বেশী দেরী না করে রাতের আহার সেরে শুয়ে পড়লাম।

তৃতীয় দিন:

শরীর খারাপ থাকায় রাতে ঘুম হলনা ঠিকঠাক। আমার আরেক সহযাত্রীর ও এক অবস্থা। তাই আমরা আজ ঠিক করেছি বৈদিনি বুগিয়াল থাকব। বৈদিনি বুগিয়ালের উচ্চতা 12000 ফুটের আসেপাশে। ঘুম থেকে উঠলাম দেরি করে। সামন‍্য গরম চা খেলাম। ঝকঝকে পরিবেশ আর ঠান্ডা বাতাসে শরীর টা বেশ ভালোই লাগছে। গাইডরা মালপত্র গোছাচ্ছে। সকাল 9 টায় আমরা বেরলাম বৈদিনির উদ্দেশ্যে। শুধু সবুজ আর সবুজ। সবুজের বুক চিরে পাকদন্ডি সরু পথ উপরের দীকে উঠে গেছে। আকাশে উড়ছে গোল্ডেন ঈগল। হিমেল হাওয়া আর মেঘ রদ্দুরের লুকোচুরি, কল্পনার জগতে হারিয়ে গেলাম। 1.30 ঘন্টা চলার পর গাইড বলল উহাপে জো রিজ দিখাই দে রাহা হে ও পার কারনেসে বৈদিনি বুগিয়াল মিলেগা। আর 1 ঘন্টার পথ। দেখতে দেখে রিজের উপর এসে পড়লাম। সেখান থেকে দেখতে পেলাম গোটা ভ‍্যালিটা। ভেড়া চরে বেরাচ্ছে চারিদিকে। কয়েকটি ছোট পাথরের মন্দির। তার মাঝেই নন্দা মায়ের স্নান করার জায়গা। বৈদিনি কূন্ড। আমরা শুয়ে পড়লাম সেখানে। মাথার উপর ঘন নীল আকাশ। চোখটা লেগে গেল কিছুক্ষণের জন্য। জুতো মোজা খুলে শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি। সে এক অদ্ভূত অনুভূতি। দুরের ভেড়ার দলকে মনে হচ্ছে যেন পাথর পড়ে আছে। সামনেই আমাদের আজকের ক‍্যাম্প। সামনে কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা। আর কাঁটা তারের ওপাশে দেখা গেল সাতরঙা রামধনু। সবমিলিয়ে স্বপ্নের জগৎ। দুপুর 1 টা হঠাৎ ঘন মেঘের আড়ালে চলে গেল গোটা ভ‍্যালিটা। ভেড়ার দল ঘরে ফিরে আসছে। আমরা আজকে মেষ পালকের ঘরেই থাকব ঠিক করলাম। শুরু হল তুমুল বৃষ্টি আর সাথে বড় বড় বরফ টুকরো। টিনের চালের ঘর মনে হচ্ছে ফেটে যাবে। পাশে ভেড়ার ঘর, প্রায় শখানেক ভেড়া। তাদের চিৎকারে কান ঝালাপালা‌। বৃষ্টি থামার নাম নেই। সন্ধ্যায় মুড়ি আর পকোড়া খেতে খেতে অনেক কাহিনি শুনলাম মেষ পালকের মুখে। শরীর ও আগের থেকে অনেক সুস্থ। গাইড রাতের আহারের আয়োজন ক‍রছে। বৃষ্টি হয়াতে আবহাওয়া একটু গুমোট। রাত 8 টার সময় খাবার খেয়ে নিলাম। কালকে র আবহাওয়া যেন ভাল থাকে সেই কথা মনে করে ঘুমিয়ে পড়লাম।

চতুর্থ দিন:

সারা রাত ভেড়ার দলের চিৎকার শুনে ঘুম হয়নি ঠিক মত। সকালে ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই নন্দু জি, সাব জি চায়ে। আবহাওয়া মোটামুটি ঠিকঠাক। মেঘের আনাগোনা আছে। আজ আমরা যাব বগুয়াবাসা। উচ্চতা 4300 মিটার মত। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে আজ আমাদের। তাই দেরি না করে প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম। ছোট পাথরের মন্দির আর বৈদিনি কুন্ডের পাশ দিয়ে খাড়া পথ উপরের দিকে উঠে গেছে। শেষ বারের মত বেদনি কুন্ড আর সবুজে ভরা বুগিয়াল দু চোখ ভরে দেখে নিলাম। আধ ঘন্টা থেকে 45 মিনিট চড়াই হাঁটার পর আমরা এসে দাঁড়ালাম একটা রিজের উপর। এক দিকে উঁচু পাহাড় আর দিকে পাহাড়ের 80 ডিগ্রি ঢাল সোজা গিয়ে মিশেছে বেদনি বুগিয়ালে। তার মাঝখান দিয়ে সরু পথ চলে গেছে। সোনালী ঘাসে ভরা চারিদিকে। মনোরম পথ। ঘন্টা দুয়েক চলার পর মেঘের আওয়াজ। চারিদিক ভরে গেল ঘন কালো মেঘে। শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। ব‍্যাগ থেকে প্লাস্টিক বের করে গায়ে চাপালাম। মেঘ আর বৃষ্টিতে সব ঝাপসা। দাঁড়িয়ে থেকে লাভ হবেনা, তাই চলতে লাগলাম ওই অবস্থায়। খুবই ধীরে হাঁটছি। গাইড বলল এসে বারিশ চলেগা তো হাম আজ বগুয়াবাসা নেহি যা পায়েগা। চরম আশঙ্কা মনে জেগে উঠল। যত এগচ্ছি পথ তত ভয়ংকর হচ্ছে। একটা জায়গা এল রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। ডানদিকটা পাথরনাচুনি হয়ে বগুয়াবাসা, আর বাম দিকটা ঘোড়ালোটানি। আমরা যাব ডানদিকে। বৃষ্টি তে সব ভিজে একাকার, ঠান্ডা য় কাঁপছি। হেঁটে চলেছি সেই অবস্থা য়। পাশ দিয়ে গভীর খাদ নেমে গেছে 200 থেকে 300 ফুট নীচে। হঠাৎ ঝোড় হাওয়া আর পাথ‍রের টুকরোর মত কি জেন পড়তে লাগল। মাথায় পড়লে আর রক্ষা নেই। গাইড বলল ওলে গির রাহা হে। আশ্রয়।নিলাম পাথরের খাঁজে। কিছুটা সময় পর ওলে পড়াটা বন্ধ হল, কিন্তু ঝোড় হাওয়া আর বৃষ্টি র তেজ আর বেড়ে গেল। না বসে থেকে লাভ নেই ঠান্ডায় হাইপোথেরামিয়া হয়ে যাবে। ঝড়ের বেগ এতটাই যে মনে হচ্ছে ঠেলে পিছনে সরিয়ে দেবে। গাইড বলল পাথরনাচুনি দিখাই দে রাহা হে। মনে বল পেলাম, হাঁচড়ে পাঁচড়ে দৌড় দিলাম। দুটো ট্রেকাস হাট আছে এখানে। ঢুকে পড়লাম সেখানে। জুতা মোজা আর গায়ে যা ছিল সব খুলে ফেললাম। চরম ঠান্ডা। গরম সুপ দিল গাইড রা। সত্যি কি অমানুষিক পরিশ্রম করে ওরা। ভাবলে অবাক হতে হয়। ওপর থেকে দুজন নেমে এল, ওরাও বাঙালি। ওরা বলল আমরা কৈলুভিনায়কের আগে একটা গুহা মত ছিল সেখানে ঢুকে পড়ছিলাম। সামনে রাস্তা আরো চড়াই আর আবহাওয়া খুবই খারাপ। ওরা ওদের যাত্রা কেনসেল করে দিয়েছে। আমরা পাথরনাচুনিতে আজ থাকব। হাওয়ার এত তেজ মনে হচ্ছে টিনের ঘরটাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। ঝড় আর বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। সন্ধ্যায় চলল আড্ডা আর খাওয়া। গাইডরা রাতের আহারের আয়োজন করছে। তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে নিলাম। টানা 7 ঘন্টা এক আবহাওয়া। ব‍্যাপরটা ভাল ঠেকছেনা। চরম উৎকন্ঠা মনে নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।

পঞ্চম দিন:

আগের দিন সারারাত প্রবল বৃষ্টি আর ঝোড় হাওয়া চলেছে। একটানা । সকাল 6 টায় ঘুম থেকে উঠেছি। বিভীষিকাময় রাত্রি যাপনের পর আজকের আবহাওয়া অনেক পরিষ্কার। আজ আমরা যাব বগুয়াবাসা। উচ্চতা 4300 মিটার মত‌। পাথরনাচুনির উচ্চতা 3700 মিটার মত। আজকের রাস্তা ভালই চড়াই আছে। আমরা প্রাতরাশ সেরে মালপত্র গুছিয়ে বেরিয়ে পরলাম বগুয়াবাসার উদ্দেশ্যে। একটা পাহাড় টপকাতে হবে আজ আমাদের। নন্দূ জি ও পাহাড় কে চটি পার হে কৈলুভিনায়ক। স্বয়ং গনেশ জি ওখানে বসে পাহারা দিচ্ছে। ধীরে ধীরে খাড়া পথ উপরের দিকে উঠে গেছে‌। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। রাস্তা র সৌন্দর্য অকল্পনিয়। সেই সোনালী ঘাসের বুগিয়াল। যত দুর চোখ যায় শুধু ধোঁয়ার মত পাহাড় শ্রেণী। কৈলুভিনায়ক টপ দেখা যাচ্ছে। আর একটু গেলেই এসে পড়ব। শেষ চড়াই টা ভাঙতেই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। একের পর এক শ্বেত শুভ্র শৃঙ্গ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাড়িয়ে আছে। ত্রিশূল, নন্দাঘুন্টি, হাতি ঘোড়ি, চৌখাম্বা একেবারে ডান দিকে মাইকতোলি। সামনে গনেশ জির মন্দির। দুরে বিকট আওয়াজ শোনা গেল। বরফ ভাঙার শব্দ। আমরা পূজা দিলাম কৈলুভিনায়কে। কিছুক্ষন বসে থাকলাম শেখানে। রোদ ঝলমলে আকাশ। দুরে দেখা যাচ্ছে বগুয়াবাসা ক‍্যাম্প সাইট। এখন আর সবুজের চিহ্ন নেই। রুক্ষ পাথুরে পথ চলে গেছে বগুয়াবাসার দিকে। পথে পড়ল ছোট ছোট পাথরের তৈরি ঘর। এই জায়গাটা র নাম হুনিয়াথার। অক্সিজেন মাত্রা অনেক কম এখানে। দেখতে দেখতে এসে পড়লাম বগুয়াবাসা। বিশাল পাথুরে জমি, তার উপর তাবু পড়েছে অনেক দলের। সামনে ত্রিশূল স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। তার কোলেই মেঘের আড়ালে রূপকূন্ড। তার পাশ দিয়ে উঠে গেছে জুনারগলি কল। আমরা আজ ট্রেকাস হাটেই থাকব। গাইড রা দুপুরের আহার তৈরি করছে। বেলা বাড়ার সাথেই মেঘে ঢেকে গেল গোটা ভ‍্যালিটা। আবার নামল সেই বৃষ্টি। আমরা খাওয়া শেষ করলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি উধাও। শান্তি পেলাম। বিকাল হতেই প্রকৃতি আমাদের জন্য খুলে দিল মন ভোলান রূপ। ত্রিশূল শৃঙ্গ আগুন রঙে আবৃত আর মেঘের মধ্যে দিয়ে আলো র ছটা বেরিয়ে আসছে। হিমেল হাওয়া বলে যাচ্ছে তোমাদের জন্য ই সবকিছু। কোন হুশ নেই, একটা কল্পনার জগৎ। হুশ ফিরতে ঠাণ্ডার অনুভূতি টের পেলাম। থর থর করে কাঁপছি। গায়ে জ‍্যাকেট টা চাপিয়ে দিলাম। আঁধার ঘনিয়ে এল ধীরে ধীরে। আমরাও ট্রেকাস হাটে ঢুকে আশ্রয় নিলাম স্লিপিং ব‍্যাগে। বাইরের তাপমাত্রা -2 ডিগ্রি হবে। সন্ধ্যা 7 টার মধ্যে খাওয়া শেষ করলাম। কাল ভোর 3 টের সময় বেরব রূপকূন্ডের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে জুনারগলি কল দেখে বগুয়াবাসায় এসে মালপত্র নিয়ে চলে যাব সুতোল। এই কথা আলোচনা করে আমরা নিদ্রাগামী হলাম।

শেষ দিন:

রাত 2.30 নন্দু জির ডাক, সাব জি উঠিয়ে!!! স্লিপিং ব‍্যাগ ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছেনা। গায়ে জ‍্যাকেট চাপিয়ে বাইরে বেরলাম। প্রচন্ড ঠাণ্ডা। তাপমাত্রা -5 ডিগ্রি হবে। নন্দু জি কফি দিল সবাইকে। আমাদের জিনিস সব এখানেই থাকবে। একটা ছোট ব‍্যাগের মধ্যে শুকনো খাবার নিয়ে নিলাম। মাথায় হেড ল‍্যাম্প লাগিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে। আগের রাতে কিছুটা তুষারপাত হয়েছে। রাস্তায় বরফ আছে, তাই চলতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে পিচ্ছিল পথ চলতে খুবই অসুবিধা হচ্ছে। রাস্তা পুরো পাথরে ভরে আছে, তার উপরে বরফ। দুরে দেখা যাচ্ছে রূপকূন্ড, আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আলো ফুটছে আকাশে। চৌখাম্বা গিরি শিখর ভেসে উঠল চোখের সামনে। আলো ফোটার সাথেই চারপাশে র পরিবেশ টাও বদলে গেল। সব কষ্টের অবসান। রাস্তা খুবই সরু তাই খুবই সাবধানে চলতে হচ্ছে আমাদের। আর বেশি বাকি নেই। গাইড বলল অর আধা ঘন্টে কি রাস্তা বাকি হে। শেষ দিকটায় রাস্তা খুবই ভয়ানক। কিছুদুর চলার পর একটা চড়াই ভাঙতেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল!!! সামনে পাথরের উপর রাখা কিছু কঙ্কাল,।আর মাটিতে ছরিয়ে আছে অসংখ্য হাঁড় গোড়।  আমি থমকে গেলাম । ছমছম করে উঠল গা। সামনে রূপকূন্ডের মন্দির দেখা যাচ্ছে। তার পাশ দিয়ে বরফ বিস্তৃত জিয়ুনারগলি কল উঠে গেছে। আমার সহযাত্রী রা সব একে একে চলে এল। জরিয়ে ধোরলাম একে অপ‍রকে। সামনের দিকে এগতেই নজরে পড়ল বিখ্যাত রূপকূন্ড লেকের। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা, তার কোলে এই লেক। দু চোখ ভরে দেখা। মন্দিরে পূজা দিলাম সবাই। পূজা দিয়ে আমরা চললাম জিয়ুনারগলির পথে। রূপকূন্ডের উচ্চতা 16200 ফুট, আরও 300 ফূট উঠতে হবে। শুধু বরফ আর বরফ। দুদিকেই নেমে গেছে গভীর খাদ। যেদিকে।তাকাই শুধু সাদা। ভয়ানক পথ পেরিয়ে উঠে এলাম জিয়ুনারগলি কলের টপে। উঠেই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। সামনে দেখা যাচ্ছে নন্দাঘুন্টির শিখর। ডানদিকে বরফে ঢাকা ত্রিশূল গিরীশ্রেণি। নীচে শীলাসমুদ্রম হিমবাহ। এই পথেই আমাদের যাওয়ার কথা ছিল রন্টি স‍্যাডেল। ত্রিশূল আর নন্দাঘুন্টির মাঝে দেখা যাচ্ছে রন্টি স‍্যাডেল। কিন্তু যেতে পারলামনা। একদিন নিশ্চয়ই আসব আবার এই পথে। প্রকৃতির কাছে আমরা তুচ্ছ। সব মিলিয়ে এক অসাধারণ দৃশ্য। আবেগ কেউ আর চেপে রাখতে পারলাম না। এবার ফিরতে হবে। পিছনে তাকিয়ে সব দেখে নিলাম আর একবার। নেমে এলাম রূপকূন্ডে। আবেগঘন মুহূর্তে সবার চোখে জল। যে পথে এসছিলাম সেই পথেই ফিরলাম বগুয়াবাসা। সেখানে দুপুরের আহার সেরে মালপত্র গুছিয়ে নিলাম। রূপকূন্ডকে বিদায় জানিয় আমরা কৈলুভিনায়ক, তাতাড়া গ্রাম হয়ে রাত 8.30 পৌছলাম সুতোল। প্রায় 14 ঘন্টা হাঁটলাম। পুরোটাই ছিল জঙ্গলে ঘেরা পথ। পায়ে আর কোন সার নেই। হোটেলে পৌছেই সজ্জাসায়ি। পরের দিন সুতোল থেকে সিতেল অবধি হেঁটে সেখান থেকে গাড়ি ধরে ঘাট। ঘাটে রাত্রি যাপন। গাইডরাও আমাদের সঙ্গী। ওদের ছেড়ে দিতে হবে রূদ্রপ্রয়াগ। দুপুরে গাড়ি পৌছাল রূদ্রপ্রয়াগ। গাইডদের বিদায় জানানোর পালা। জরিয়ে ধরলাম ওদের। ঠিক সে জানা সাব জি। জাকে ফোন জরুর কারনা। ফিরসে আনা। ওদের বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। গন্তব্য হরিদ্বার। সন্ধ্যায় পৌছলাম হরিদ্বার। আজ রাত 11.15 ট্রেন। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম শেষ করলাম সেখানেই। বাকিটা ইতিহাস।

ফটোগ্রাফি : অরিত্র মল্লিক

......…..............সমাপ্ত.............

No comments:

Post a Comment