Thursday, June 24, 2021

মদমহেশ্বর



উত্তরখণ্ডের গাড়োয়াল হিমালয়ের কোলে এক ছোট্ট গ্রাম, নাম তার মানসুনা ভিলেজ। হিমালয়ের আর দশটা পাহাড়ি গ্রামের মতই সাধারণ এ গ্রাম টাকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করছে মর্যাদাপূর্ণ এক মন্দির। ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংগ হয়ে উঠেছে এই গ্রাম। কারণ পঞ্চ কেদারের একটা অংশ রয়ে গেছে এখানেই। 

গাড়োয়াল হিমালয়ের পাঁচ শিব মন্দিরের একটি এখানেই, কেও পাঁচ কেদার দেখতে চাইলে তাকে এখানে আসতেই হবে, তবে তার থেকেও বড় কথা, এই ট্রেকের পথে ঘাটে প্রকৃতি যে অকৃপণ হাঁতে সৌন্দর্য্য ছিটিয়েছে তা দেখতে হলেও আসতে হবে এখানে। এই ট্রেকের ব্যাপারে ট্রেকারদের বহুল প্রচলিত মন্তব্য হল- এখানে একবার যেয়ে মন ভরে না, বারবার ফিরে যেতে হয় এই ট্রেকে। ভারতের এক জনপ্রিয় গ্রুপে 'কোন ট্রেকে তারা বারংবার ফিরে যেতে চান' এমন প্রশ্ন করা হলে বেশিরভাগ উত্তরে আসে মদমহেশ্বর এর নামটি। কি এমন আছে এই ট্রেকে?  

মদমহেশ্বর এর গল্পটা শুরু অনেক আগে, সেই মহাভারতের যুগে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে জয়লাভ করতে কৌরবদের হত্যা করলেন পঞ্চপান্ডব, কিন্তু এতে করে তারা ভাই হত্যা ও ব্রাহ্মণ হত্যার মত গুরুতর পাপে পাপী হলেন। অনেক রক্ত ঝরিয়ে যুদ্ধ তো একসময় শেষ হল, কিন্তু পান্ডব ভাইয়েরা নিজেদের মনের শান্তি হারিয়ে ফেললেন চিরতরে। 

স্বজনদের হাতে রাজ্য পরিচালনার ভার ছেড়ে দিয়ে পাঁচ ভাই বেড়িয়ে পড়লেন শিব এর খোঁজে। উদ্দেশ্য তার আশীর্বাদ নিয়ে কিছুটা হলেও মনের শান্তি ফিরে পাওয়া। অনুশোচনার আগুন দগ্ধ হয়ে কিছুটা হলেও পাপমোচন।  প্রথমেই তারা গেলেন কাশী। কারন এটাই শিবের ধাম নামে পরিচিত, এখানেই আছে অসংখ্য শিব মন্দির। কিন্তু শিব তাদের কেবলি এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, এরকম ভয়ংকর পাপবিদ্ধ মানুষকে আশীর্বাদ করা সম্ভব নয় তার পক্ষে। 

কাশী তে শিব কে না পেয়ে তারা গেলেন গাড়োয়াল হিমালয়ে, সেখানে দুই পাহাড়ের মাঝামাঝি দাড়িয়ে তারা দেখলেন গুপ্ত কাশীর কাছাকাছি এক বিশাল ষাড়। পঞ্চপান্ডবের এক পান্ডব ভীম দর্শনমাত্র চিনে ফেললেন যে এই ষাড়ের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছেন স্বয়ং শিব! তড়িৎ ছুটে যেয়ে তিনি ষাড়ের লেজ ও পেছনের পা জড়িয়ে ধরলেন। 

শিব তৎক্ষণাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে যান, এবং খন্ডবিখন্ড হয়ে পুনরায় আবির্ভুত হন। কেদারনাথে তার কুজ আবির্ভুত হয়, বাহুদ্বয় তুঙ্গনাথ এ, চেহারা রুদ্রনাথ এ, চুল ও মাথা কল্পেশর এ এবং নাভি ও পেট আবির্ভূত হয় মদমহেশ্বর এ।  পান্ডব ভাইয়েরা এই পাচজায়গাতেই মন্দির স্থাপন করে, যা এখন পাচকেদার নামে তীর্থস্থান হিসেবে সুপরিচিত।

এই পাচকেদার এর অন্যতম এক কেদার হল মদমহেশ্বর। 

মন্দির এ তীর্থ দর্শন ছাড়াও আর একশ্রেনীর লোক আসে এই বরফ শীতল পাথুড়ে ভূমিতে বহু পথ মাড়িয়ে, তারাও তীর্থ দর্শনেই আসে, কিন্তু তাদের তীর্থ হল পাহাড়, প্রকৃতি।  ধর্মীয় মিথ কে ছাপিয়ে  এই পাহাড়ের এক আলাদা আকর্ষনী শক্তি আছে, যা ট্রেকারদের টেনে নিয়ে আসে এই পথে, বারবার।  

মদমহেশ্বর এর পুরো ট্রেক যেন হিমালয়ের সবটুকু সৌন্দর্য্য বুকে জড়িয়ে স্থানু হয়ে আছে এখানটায়। কি নেই এই পথে, তুষার ঢাকা বিশাল সব শুভ্র পাহাড়, নীল জলের সরোবর, আর আদিগন্ত বিস্তৃত চোখ ধাঁধানো সবুজ, আছে মেঘ পাহাড়ের মিতালি। 

মদমহেশ্বর সমতল থেকে ৩৪৯৭ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। তাই এই ট্রেকে যেতে হলে মনোবল এর পাশাপাশি উচ্চতায় মানিয়ে নেয়ার ও ব্যাপার আছে। অপরদিকে, এই মন্দির বছরে মাত্র ৬ মাস খোলা থাকে ( মে থেকে অক্টোবর), তাই যাওয়ার আগে এই বিষয়গুলো একটু খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া উচিৎ হবে। 

চতুর্থ দিন উখীমঠ-যোগাসু-ওনিওনা-রাঁশি-গাড়িপথ

রাঁশি (১৯৮০মি)-গৌণ্ডার (২০৭০মি)-৭কিমি

উখীমঠ থেকে গাড়ি চেপে মনশুনা, যোগাসু ও ওনিওনা ছাড়িয়ে রাঁশির কাছাকাছি পৌঁছন যায়। সুন্দর হাঁটাপথে উঠে আসবেন রাঁশি গ্রামে। রাঁশি থেকে প্রায় সমতল পথে আরও ঘণ্টা দুয়েক হাঁটলেই গৌণ্ডার পৌঁছে যাবেন।

গৌণ্ডার-বানতোলি-খাডোরা (২০২০মি)-নানু (২৩৩০মি)-মদমহেশ্বর (৩৪৯০মি)-১০কিমি

গৌণ্ডার থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বানতোলি। মার্কণ্ডেও গঙ্গা ও মদমহেশ্বর গঙ্গার সঙ্গমস্থলের নিকটে এই ছোট্ট সুন্দর জায়গাটিতেও থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আগের দিন এখানে রাত্রিবাস করতে পারেন। এখান থেকে শুরু হবে কঠিন চড়াইপথ। বড় বড় গাছপালার মধ্য দিয়ে প্রশস্ত পথ। ক্রমে মদমহেশ্বর গঙ্গার প্রবাহ দূরে চলে যাবে। স্পষ্ট হবে গৌণ্ডার ও রাঁশি গ্রাম। খাডোরা চটিতে টুকটাক খাবার পাবেন। ঘাস ও গুল্মে ঢাকা পাহাড়ের ঢাল ধরে পাকদণ্ডী চড়াইপথে উঠে আসবেন নানু। এখানেও দোকান ও জলের ব্যবস্থা আছে। বনের মধ্যে মাঝে মাঝেই উন্মুক্ত ঘাসের ঢাল রয়েছে। পথের দূরত্ব কম হলেও সবটাই চড়াইপথ। অনেকটা সময় লাগবে। মাত্র ৯ কিলোমিটার পথে উঠতে হবে চার হাজার ফুট। উঠে আসবেন মদমহেশ্বরে। ধারাবাহিক সবুজের মাঝে পাহাড়ের কোলে মদমহেশ্বর মন্দির অসাধারণ। এখানে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

মদমহেশ্বর-গৌণ্ডার-রাঁশি-১৭কিমি

খুব ভোরে উঠে আসুন বুড়ো মদমহেশ্বেরের মন্দিরে। ঘাসে ঢাকা প্রান্তরের মাঝে এক ছোট্ট মন্দির। এখান থেকে চারপাশের দৃশ্য অপূর্ব। চৌখাম্বা ও মান্দানি শৃঙ্গমালাকে খুব কাছ থেকে দেখা যাবে। আছে এক ছোট্ট জলাশয়। তারপর নেমে আসুন মদমহেশ্বরে। একই পথে একটানা নেমে আসবেন বানতোলি। বানতোলি থেকে চলে আসবেন রাঁশি। রাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে এটি একটি বড় গ্রাম।



No comments:

Post a Comment